প্রচ্ছদ

কারাগারে 'রাজার হালে' ওসি প্রদীপ

2020/09/29/_post_thumb-2020_09_29_15_49_14.jpg

আদালত থেকে কারাগারে ডিভিশন না মিললেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদেশে  ডিভিশন-১ ভোগ করছেন টেকনাফের সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। গত ২৬ সেপ্টেম্বরের পর থেকে তিনি এ সুবিধা ভোগ করছেন বলে কারাগার সূত্রে জানা গেছে। ফলে সিনহা হত্যাকাণ্ডে সমালোচিত দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দি বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ কারাগারে রাজার হালেই আছেন। কারাগারে ডিভিশন পাওয়া বন্দিদেরকে রাজার হালেই থাকার সাথে তুলনা করেন  বন্দিরা। তবে এ বিষয়ে কোনো রকম মন্তব্য করতে রাজি হননি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষ।

জানতে চাইলে জেলার রফিকুল ইসলাম বলেন, 'এ বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার আমার নেই। জেলা প্রশাসকই এ বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার রাখেন।' 

পরে জেলা প্রশাসকের চলতি দায়িত্বে থাকা ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজির সঙ্গে সোমবার বিকেলে সিভয়েসের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'আমি একটা মিটিং এ আছি। পরে কথা বলি?'

এরপর সন্ধ্যায় আরেক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে জেলা প্রশাসকের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। 

এদিকে আজ ২৮ সেপ্টেম্বর প্রদীপের বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আশফাকুর রহমানের আদালত একটি নির্দেশনা দিয়েছেন। এতে বলা হয়, প্রদীপ দাশ আত্মীয়-স্বজন ও তার আইনজীবীদের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবেন না। তবে প্রদীপ চাইলে আত্মীয়-স্বজন ও আইনজীবীদের সাথে কারাবিধি অনুযায়ী টেলিফোনে কথা বলতে পারবেন। কারাগার থেকে আসা একটি রিপোর্টের উপরই এ শুনানি শেষে আদালত এ আদেশ দেন। 

এর আগে গত ২৬ সেপ্টেম্বর আত্মীয়-স্বজন ও আইনজীবীর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবেন বলে আদেশ দেন মহানগর দায়রা জজ আশফাকুর রহমানের আদালত।

দুদকের আইনজীবী মাহমুদুল হক সিভয়েসকে জানান, আত্মীয়-স্বজন ও আইনজীবীদের সাথে প্রদীপ সাক্ষাৎ করতে পারবেন এমন আদেশটি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন আদালত। এখন থেকে প্রদীপ শুধুমাত্র আত্মীয়-স্বজন ও তার আইনজীবীদের সাথে টেলিফোনে কথা বলতে পারবেন। কেননা বর্তমানে কারা কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্দিদের টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ দিয়েছে। 

ডিভিশনের বিষয়ে জানতে চাইলে মাহমুদুল হক বলেন, 'চট্টগ্রামের আদালত থেকে প্রদীপের ডিভিশন বিষয়ে কোনো আদেশ হয়নি। অন্য কোথাও থেকে হয়েছে কিনা তা বলতে পারবো না।'

গত ১৪ সেপ্টেম্বর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কারাগারে থাকা প্রদীপকে দুদকের করা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। সেই থেকে চট্টগ্রাম কারাগারেই আছেন প্রদীপ দাশ।

এর আগে গত ৩১ আগস্ট রাত সাড়ে ৯টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ ঘটনায় নিহতের বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বাদী হয়ে প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ নয় জনকে আসামি করে টেকনাফ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৫ আগস্ট সকালে মামলা দায়ের করেন। ৬ আগস্ট টেকনাফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত (আদালত নম্বর-৩) এর বিচারক মো. হেলাল উদ্দিনের আদালতে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া সাত আসামি আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে বিচারক জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে সবাইকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপরই তাদের সবাইকে বরখাস্ত করা হয় পুলিশ বাহিনী থেকে। 

প্রদীপের ডিভিশন প্রাপ্তি নিয়ে চট্টগ্রাম কারাগারের জেল সুপার কামাল উদ্দিন এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজিই হননি। অন্যদিকে ডিভিশনের বিষয়টি পরোক্ষভাবে স্বীকার করলেও কথা বলতে রাজি নন জেলার রফিকুল ইসলামও।

তবে কারাগারের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, গত ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে চট্টগ্রাম কারাগারের ডিভিশন ১ বন্দির মর্যাদা পাচ্ছেন পুলিশের বরখাস্ত ওসি প্রদীপ। তিনি ডিভিশন ওয়ার্ডে ভারতীয় নাগরিক জিবরান তায়েবী হত্যা মামলার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি ইয়াছিন রহমান টিটুর পাশের রুমেই থাকছেন। 

 এর আগে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ খুনের তদন্ত চলার মধ্যে গত ২৩ আগস্ট চুমকি কারণ ও তার স্বামী প্রদীপের বিরুদ্ধে প্রায় ৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেন দুদকের সহকারী পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন। মামলায় প্রদীপ দম্পতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ২৬(২) ও ২৭(১), মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ দমন আইন- ২০১২ এর ৪(২), ১৯৪৭ সালের দূর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা ও দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। ওই মামলা সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেন আদালত ও গ্রেপ্তারও আছেন প্রদীপ দাশ। 


ডিভিশনপ্রাপ্তরা কী ধরনের সুবিধা পান?

জেল কোড অনুসারে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কারাগারে ডিভিশন প্রদান করা হয়। এছাড়া আদালতের নির্দেশেও কাউকে কাউকে ডিভিশন দেওয়া হয়। জেল কোড অনুযায়ী তিন শ্রেণীর ডিভিশন দেওয়া হয়ে থাকে। ডিভিশন-১, ডিভিশন-২ এবং ডিভিশন-৩।

বিধি অনুসারে প্রথম শ্রেণীর ডিভিশন-প্রাপ্তদের প্রত্যেক বন্দির জন্য আলাদা রুম থাকে। খাট, টেবিল, চেয়ার, তোষক, বালিশ, তেল, চিরুনি, আয়না সবকিছুই থাকে। আর তার কাজকর্ম করে দেওয়ার জন্য আরেকজন বন্দিও দেয়া হয়। ছেলে বন্দির ক্ষেত্রে সাহায্যকারী হিসেবে ছেলে আর মেয়ে বন্দির জন্য একজন মেয়ে থাকবেন।

এছাড়া তিনি বইপত্র পাবেন এবং তিনটি দৈনিক পত্রিকা পাবেন। সাধারণ বন্দিদের চেয়ে ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দির খাওয়ার মানও ভাল থাকে। ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দীদের জন্য টাকার পরিমাণটি বেশি থাকে। এ কারণে তারা চিকন চালের ভাত পান। সকালে রুটি, ডিম, কলা, ভাজি, বাটার, জ্যাম-জেলি চাইলে সেগুলোও দেওয়া হয়। দুপুরে ভাত-মাছ-মাংস তাদের সাথে কথা বলে ঠিক করা হয়। কিন্তু সাধারণ বন্দিদের ক্ষেত্রে এসব সুযোগ থাকে না।


জেল কোড: ডিভিশন পাওয়ার যোগ্য কারা?

জেল কোডের ৬১৭ নং বিধিতে বলা হয়েছে যে, সাজাপ্রাপ্ত বন্দী ডিভিশন ১, ২ ও ৩ এই তিনটি ডিভিশনে বিভক্ত হবে। এর মধ্যে নাগরিকত্ব নির্বিশেষে নিম্নোক্ত বন্দিরা ডিভিশন ১ প্রাপ্তির যোগ্য হবেন-

(ক) যারা ভাল চরিত্রের অধিকারী ও অনাভ্যাসগত অপরাধী। (খ) সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা এবং অভ্যাসের কারণে যাদের জীবনযাপনের ধরন উচ্চমানের।

(গ) যারা নিম্নোক্ত অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত নয়- নৃশংসতা, নৈতিক স্খলন এবং ব্যক্তিগত প্রতিহিংসামূলক অপরাধ।মারাত্মক বা পূর্বপরিকল্পিত হিংস্রতা। সম্পত্তি সংক্রান্ত মারাত্মক অপরাধ। অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে বা অপরাধ সংঘটনের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিস্ফোরক আগ্নেয়াস্ত্র এবং অন্যান্য মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র সঙ্গে রাখা। উপরোক্ত অপরাধ সংগঠনের জন্য প্ররোচিত বা উত্তেজিত করা।

মন্তব্য