প্রচ্ছদ

ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিরুদ্ধে হাটহাজারিতে তরুণ আলেমদের প্রতিরোধ

2020/09/17/_post_thumb-2020_09_17_17_17_48.png

ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের সাথে আঁতাতকারী ও সরকার থেকে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধাভোগী হিসাবে পরিচিত আল্লামা আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানীকে দেশের বৃহত্তম কওমি মাদ্রাসা হাটহাজারী থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি। তাঁকে মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পাশাপাশি ছাত্রদের পেশ করা ৫ দফার বাকী ৪ দফা মেনে নেয়ারও আশ্বাস দেয়া হয়েছে। গতকাল দুপুরের পর থেকে ছাত্রদের উত্তাল বিক্ষোভের মুখে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি এই সিদ্ধান্ত নেয়। ছাত্রদের বিক্ষোভ শুরু হলে প্রথমে প্রশাসনের হস্তক্ষেপের অপচেষ্টা হয়। উত্তাল বিক্ষোভে পুলিশ এসে মাদ্রাসা ঘেরাও করার চেষ্টা করলে ছাত্ররা আন্দোলন অব্যাহত রাখার দৃঢ় শপথ নেয়। এতে সরকারি প্রশাসন পিছু হটতে বাধ্য হয়। এরপর মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি তাৎক্ষণিক বৈঠকে বসে ছাত্রদের দাবী মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করে।

মাদ্রাসার মুহতামিম আল্লামা আহমদ শফীসহ শুরার অপর ৩ সদস্যের উপস্থিতে তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্তে আনাস মাদানীকে স্থায়ী বহিষ্কার চূড়ান্ত হয়। ছাত্রদের বাকী ৪ দফা নিয়ে শুরা আগামী শনিবার আবারো বৈঠকে বসবে। আন্দোলনরত ছাত্রদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, আগামী বৈঠক পর্যন্ত মাদ্রাসার মেইন গেইট ছাত্রদের দখলে থাকবে।

আনাস মাদানীর অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কওমি মাদ্রাসা অঙ্গনে দীর্ঘদিন থেকে ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হচ্ছিল। গতকাল দুপুরে ক্ষোভের আগুণ ছড়িয়ে পড়ে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে। ফ্যাসিবাদের দোসরদের মাদ্রাসা থেকে উৎখাত করতে তরুণ আলেমরা ঐক্যবদ্ধ হয়।

চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হাটহাজারী মাদ্রাসা দেশের বৃহত্তম ও প্রাচীন কওমি মাদ্রাসা। গতকাল শুরু হওয়া বিক্ষোভ থেকে সেখানে “চূড়ান্ত পয়গাম” শিরোনামে লিফলেট ছড়িয়ে দেয়া হয়। এই চূড়ান্ত পয়গামের মধ্যে রয়েছে-

এক. মাওলানা আনাস মাদানী সাহেবকে অনতিবিলম্বে মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কার করতে হবে ।

দুই. ছাত্রদের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা বাস্তবায়ন করাসহ সকল প্রকার জুলুম-হয়রানি বন্ধ করা।

তিন. আল্লামা আহমদ শফীর সাহেব মা’যুর হওয়ায় তাঁকে কার্যকরী মুহতামিম থেকে সম্মানজনক অব্যাহতি দিয়ে একজন মুখলিস, বুজুর্গ ও দক্ষ আলেমকে মুহতামিম নিয়োগ করা।

চার. মাদ্রাসা শিক্ষকদের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নিয়োগ ও অব্যাহতির বিষয়টি মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির উপর পুরোপুরি ন্যস্ত করা।

পাঁচ. মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি বা শুরা থেকে আনাস মাদানী কর্তৃক বিদায় দেয়া হক্কানি আলেমদেরকে পুনর্বহাল ও সদ্য নিয়োগকৃত বিতর্কিতদের পদচ্যুত করা।

আন্দোলনরত ছাত্ররা ঘোষণা করেন, “দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত মাদ্রাসার সকল একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। আদর্শিক এ আন্দোলনে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে সমস্ত কওমি মাদ্রাসায় আন্দোলনের দাবানল জ্বলে উঠবে। দাবী আদায়ে জেল-জুলুম সহ যেকোনো ত্যাগের জন্য ছাত্ররা প্রস্তুত রয়েছে।”

সরকারের সাথে আতাতে কওমি অঙ্গনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ:

সরকারী দলের সাথে আঁতাত এবং পিতা আল্লামা আহমদ শফীর বয়োবৃদ্ধ অবস্থাকে পুঁজি করে হাটহাজারী মাদ্রাসাসহ কওমি অঙ্গনে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার, ঈমান-আক্বিদা রক্ষায় হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করাসহ নানা অনৈতিক কর্মে জড়িত থাকার অভিযোগে আনাস মাদানীর বিরুদ্ধে কওমি মাদ্রাসা অঙ্গনে ক্ষোভ ছিল দীর্ঘদিন থেকে। পিতার প্রভাব খাটিয়ে আরেকজন শ্রদ্ধেয় আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে মাদ্রাসার দায়িত্ব থেকে জোরপূর্বক অব্যাহতি, নিজের পছন্দমত লোকদের শিক্ষক পদে নিয়োগ ও পদায়নে হস্তক্ষেপসহ বেফাক-হাইয়ায় (কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড) ব্যাপক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

গত ১২ সেপ্টেম্বর রাজধানী ঢাকায় বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার (কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড) নানা অনিয়ম ও কওমি মাদ্রাসার চলমান সংকট উত্তরণের উপায় নিয়ে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। উক্ত সভায় বক্তারা বলেন, দারুল উলুম দেওবন্দের আট নীতির ভিত্তিতে সরকার আমাদের স্বীকৃতি দেয়ার কথা থাকলেও সেই আট নীতি বা উসুলে হাশতেগানাহকে বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং বেফাককে তার সংবিধান অনুযায়ী চলতে বাধা দেয়া হচ্ছে।

উল্লেখ্য, সংবিধান থেকে বাদ দেয়া ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন’সহ ১৩ দফা দাবি নিয়ে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে জমায়েত হয় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ইসলামের জন্য সারা দেশ থেকে আলেম ছাত্র-শিক্ষকসহ দেশপ্রেমিক সাধারণ মানুষেরা শাপলা চত্বরে জড়ো হয়। এক পর্যায়ে বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের মত পুরো ঢাকা শহর ছড়িয়ে পড়ে মানুষ। কিন্তু শেখ হাসিনা রাষ্ট্র ক্ষমতা ধরে রাখতে পেটোয়া বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে গভীর রাতে বিদ্যুৎ বন্ধ করে জমায়েত হওয়া মানুষের উপর এক নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলেন। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৬১ হলেও পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবি’র যৌথ অভিযানে কত মানুষ শাহাদাত বরণ করেছেন তার কোন প্রকৃত পরিসংখ্যান আজ পর্যন্ত জানা যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শাপলা চত্বরের সম্মানিত শহীদ-গাজীদের রক্ত মারিয়ে ২০১৮ সালে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘শোকরানা মাহফিল’ করে স্বীকৃতি গ্রহণ এবং গণহত্যায় অভিযুক্ত শেখ হাসিনাকেই ‘কওমি জননী’ উপাধি প্রদান দেওবন্দী ধারার শিক্ষার ঐতিহাসিক বৈপ্লবিক অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। এরপর থেকেই কওমি অঙ্গনে আনাস মাদানীকে নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়। সরকারের সাথে আঁতাতসহ আনাস মাদানী এবং অন্য আরো কয়েকজন সুবিধাবাদী হেফাজত নেতাদের অপতৎপরতা নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয় তরুণ আলেমদের মাঝে। কওমি মাদ্রাসার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ফিরিয়ে আনা এবং অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার ঐতিহাসিক বিপ্লবী অবস্থানের তাগিদ অনুভব করে একদল তরুণ আলেম হাটহাজারীতেই আবার জেগে উঠার চেষ্টা করে। এরই ফলশ্রুতিতে আনাস মাদানীর অনৈতিক ভূমিকার প্রতিবাদে তাঁকে বহিষ্কার সহ ৫ দফা দাবী আদায়ে গতকাল দুপুর থেকে চূড়ান্ত আন্দোলনে নামেন এই তরুণরা। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তারা বাকী চার দফা দাবী আদায়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থেকে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন।

তথ্যসূত্র: আমারে দেশ


মন্তব্য