জাতীয়

করোনায় মৃত্যু কমাতে ব্যর্থ সরকার

2020/08/post_thumb-2020_08_29_13_11_18.png

প্রতিদিন করোনায় মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এসব মৃত্যু কমানোর কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথাযথ পদক্ষেপ নিলে মৃত্যু কমানো সম্ভব।

গতকাল শুক্রবার এক দিনে ৪৭ জন করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর আগের দিন মারা গিয়েছিলেন ৪৫ জন। ২৬ আগস্ট এই সংখ্যা ছিল ৫৪। ২৪ আগস্ট থেকে প্রতিদিন ৪০ জনের বেশি মৃত্যু ঘটে চলেছে। সরকার দাবি করছে, দেশে সংক্রমণ কমছে। প্রশ্ন উঠেছে, প্রতিদিন এত মৃত্যু হচ্ছে কেন? আরও বড় প্রশ্ন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করোনায় মৃত্যু কমানোর সুনির্দিষ্ট কী উদ্যোগ নিয়েছে?

নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কাজটি চালু থাকলেও করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জোরালো কাজ এখন মাঠপর্যায়ে নেই। সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে শনাক্ত করা ও শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিকে নজরদারিতে রাখা—এসব কাজ কার্যত বন্ধ রেখেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

লকডাউন (অবরুদ্ধ) করা নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেই। মাস্ক পরা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে মানুষকে সচেতন রাখার কাজ থেকেও অনেকটা সরে এসেছে অধিদপ্তর। সার্বিকভাবে সরকারের কাছে মহামারির গুরুত্ব অনেকটাই কমে গেছে বলে সাধারণ মানুষের ধারণা।

দেশে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ১৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে করোনায়। শিশু, কিশোর, তরুণ, যুবক, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ —সব বয়সী মানুষ করোনায় মারা গেছেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুর কারণে কোনো কোনো পরিবার চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে।

বাগেরহাটে একই দিনে বাবা-ছেলের মৃত্যু হয়েছে। ফরিদপুরে একই পরিবারের দুই ব্যবসায়ী ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব এই মহামারিকে ভুলতে পারবে না, এসব পরিবারও প্রিয়জনের মৃত্যু ভুলতে পারবে না। অনেক পরিবারের পক্ষে আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন।

পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে করোনায় মৃত্যু কমানোর উদ্যোগ নিতে বলেছিল। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, ‘শূন্য মৃত্যু’ লক্ষ্য রেখেই কাজ করা দরকার। কীভাবে কাজটি করতে হবে, তারও একটি লিখিত রূপরেখা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে তাঁরা দিয়েছিলেন ১৭ জুন।

কমিটির সদস্য জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল গতকাল বলেন, করোনায় মৃত্যুকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গুরুত্ব দিচ্ছে না। গুরুত্ব দিলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মৃত্যু কমানোর উদ্যোগ নিত। যথাযথ উদ্যোগ নিলে মৃত্যু কমবে।

করোনায় মৃত্যু কমানোর বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম গতকাল বলেন, করোনা রোগীর মৃত্যুর কারণ নিয়ে কোনো গবেষণা বা সমীক্ষা দেশে হয়নি। মৃত্যু কমানোর সুনির্দিষ্টভাবে কোনো উদ্যোগ না থাকলেও রোগী চিকিৎসার বিষয়ে কোনো ঘাটতি নেই। হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির করোনা হলে তাদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি। এ বিষয়ে সর্বসাধারণকে সচেতন করার জন্য গণমাধ্যমে প্রচারণা চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা

মৃত্যুর বড় ধরনের পর্যালোচনা করেছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও চীনের যৌথ মিশন। যৌথ মিশনের সদস্যরা ১৬ থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি চীনের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছিলেন।

যৌথ মিশন ওই সময় ৫৫ হাজার ৯২৪ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করেছিল। তার মধ্যে ২ হাজার ১১৪ রোগী মারা যান। মৃতদের ২১ দশমিক ৯ শতাংশের বয়স ছিল ৮০ বছরের বেশি। পেশার ক্ষেত্রে দেখা যায়, অবসরে যাওয়া বেশি মানুষ মারা গেছেন, তাঁদের হার ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। করোনা ছাড়া অন্য কোনো রোগ ছিল না, এমন মানুষের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল ১ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু দেখা গেছে, আগে অন্য রোগ থাকা মানুষের করোনা হওয়ার পর মৃত্যুহার বেশি। তাতে দেখা যায়, হৃদ্রোগ ছিল ১৩ দশমিক ২ শতাংশের, ডায়াবেটিস ৯ দশমিক ২ শতাংশের, উচ্চ রক্তচাপ ৮ দশমিক ৪ শতাংশের, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট ৮ শতাংশের এবং ক্যানসার ৭ দশমিক ৬ শতাংশের।

দেশেও নজির আছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৃত্যু কমাতে হলে প্রথমে কিছু মৃত্যুর পর্যালোচনা হওয়া দরকার। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। উদাহরণ দেশেই আছে।

রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ পর্যন্ত দুই শতাধিক করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের কয়েকজন শিক্ষক ও চিকিৎসক প্রথম ৯৩টি মৃত্যুর পর্যালোচনা করেছিলেন। মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ টিটু মিয়া বলেন, ‘ওই পর্যালোচনার অভিজ্ঞতা আমরা রোগীর চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগাচ্ছি। আমরা আগের চেয়ে মৃত্যু কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, এমনও নজির আছে, পরপর দুই দিনে একটি মৃত্যুও হয়নি।

হাসপাতালে আসার পর কখন মৃত্যু হচ্ছে, তা দেখার চেষ্টা হয়েছিল ওই পর্যালোচনায়। হাসপাতালে আসার এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে মারা গেছেন ১১ জন, প্রথম ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন আরও ২২ জন। ভর্তি হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা বা ২ দিন পর মারা গেছেন ১২ জন, ৩ দিন পর মারা গেছেন ৮ জন। বাকিরা মারা যান ৪ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে।

তখন অধ্যাপক টিটু মিয়া বলেছিলেন, মারা যাওয়া রোগীদের বড় অংশটি হাসপাতালে এসেছিলেন অনেক বিলম্বে। তাঁরা যখন হাসপাতালে এসেছিলেন, তখন অধিকাংশের অক্সিজেন পরিস্থিতি খারাপ ছিল।

ওই পর্যালোচনার ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। অধ্যাপক টিটু মিয়া বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত ঢাকা বা পার্শ্ববর্তী বড় শহরের হাসপাতালে নিতে হবে। রোগী স্থানান্তর করার সময় অ্যাম্বুলেন্সে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, রক্তে দ্রবীভূত অক্সিজেন অনেক কমে যাওয়ার পর কিছু রোগী হাসপাতালে আসেন। হাসপাতালে আসার পর ভর্তি বা ওয়ার্ড পরিবর্তন করার সময় অনেক বিপত্তি ঘটে। আবার ভুল ওষুধ বা অতিমাত্রায় ওষুধ ব্যবহারের কারণেও রোগীর মৃত্যু হতে পারে। তিনটি ক্ষেত্রেই উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়ে মৃত্যু কমানো সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সাপ্তাহিক হিসাবে বলেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে বৈশ্বিকভাবে মৃত্যু কমেছে ১২ শতাংশ। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, বাংলাদেশে মৃত্যুহার বেড়েছে।

মৃত্যু বন্ধ না করে, মৃত্যুর কারণ দূর না করে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা মৃত্যুর সংখ্যা গুরুত্বহীন প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। কেউ বলেছেন, বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় মৃত্যুর চেয়ে কম। অন্য একজন বলেছেন, সাধারণ রোগব্যাধিতে যে মৃত্যু হয়, করোনায় তার চেয়ে খুব বেশি মৃত্যু হচ্ছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও চীনের যৌথ মিশন তাদের সুপারিশে বলেছিল, পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে রোগী ব্যবস্থাপনা, রোগের পরিস্থিতি, কী কারণে রোগ মারাত্মক হচ্ছে, এসব তথ্য অব্যাহতভাবে আদান-প্রদান করতে হবে। কী কী বিষয় যুক্ত হলে রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করে, তা নিয়মিত বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করতে হবে। আর বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অন্য রোগ থাকা মানুষ করোনায় আক্রান্ত হলেই বিশেষ সতর্ক হতে হবে। অক্সিজেন পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে।

জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, কোনো মৃত্যুই কাম্য নয়। মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় কিছু পরিবর্তন এনে মৃত্যু কমানো সম্ভব। কিন্তু সবার আগে দরকার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগ।

সূত্র: প্রথম আলো

মন্তব্য