ব্রেকিং

মৌসুমী থেকে সাহারা, আরিফ জয় থেকে মাশরাফি সবাই ওই এক পথের পথিক!

2019/01/8-10.jpg

মৌসুমি কথাটির সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। মৌসুমি ফসল, মৌসুমি ফল, মৌসুমি পাখি, মৌসুমি ব্যবসায়ী। সেই সঙ্গে রয়েছে মৌসুমি রাজনীতিবিদ। মৌসুমি পাখিদের অতিথি পাখি বলা হয় কিন্তু মৌসুমি রাজনীতিবিদদের বিশেষ কোনো বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয় না। তবে তাদের অনেকেই ভাড়াটিয়া বলে থাকেন। রাজনীতিতে এই ভাড়াটিয়াদের তৎপরতা এবং প্রভাব অপরিসীম।

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক, নেত্রকোনায় প্রতিবছর ভালো ধান জন্মে না। কোনো কোনো বছর বন্যায় ধান পানিতে তলিয়ে যায় আর সেই সুযোগে অনেক মৌসুমি ধান চাষিরা মাঝি বনে যান রাতারাতি। নৌকা নিয়ে নেমে পড়েন দরিয়ায়। এমন এক রাজনৈতিক মাঝির দেখা মেলে মোহনগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে। তার নাম আবুল কালাম আজাদ, তিনি ২০১৬ সালে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে হেরে যান, ২০১৮ সালে নৌকার প্রার্থী রফিকুল ইসলাম মারা গেলে মৌসুম পরিবর্তনে উপ-নির্বাচনে আবুল কালাম আজাদ বনে যান নৌকার মাঝি। এবং বাজিমাত করেন তাতে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল, আগের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক এবং খালেদা জিয়ার ছবি সংবলিত পোস্টারের চিহ্ন মুছে না যেতেই আবার নতুন করে নৌকা মার্কার পোস্টার অনেক জায়গায় দেখা গেলে সে সময় বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি করে। পরে জেলা ছাত্রলীগের এক নেতা সেটি ফেসবুকে শেয়ার করলে ভাইরাল হয়। আবুল কালাম আজাদ একটি প্রতীকী চরিত্র। রাজনীতিতি এমন আয়নাবাজ মৌসুমি মাঝিদের জয়জয়কার।

এসব মৌসুমি রাজনীতিবিদ রাজনীতির মাঠে বেশ শক্ত। তাদের হয় পকেটে টাকা আছে না হয় আছে ক্ষমতা। কেউ সাবেক ডাকসাইটে আমলা, কিংবা বিচারক, পুলিশ, ডাক্তার, উকিল, মোক্তার, শিক্ষক, ব্যবসায়ী থেকে কেউ বাদ যায়নি। অবসরপ্রাপ্তের বাইরে আছে নায়িকা, গায়িকা, মালাইকা কিংবা শিল্পী। মৌসুমি এসব নেতাদের মধ্যে আছেন ফুটবলার, ক্রিকেটার, দাবাড়–, সাঁতারু সবাই। এ অবস্থা দেখে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, রাজনীতি গরিবের বউ হয়ে গেছে, গরিবের বউ সবার ভাউজ (ভাবী)।

মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে আনাগোনা কোরবানি এলে। সারা বছর যারা টুকটাক রসুন, পিয়াজ ব্যাপারী, কিংবা আদার ব্যাপারী, আদম ব্যাপারী, গাছ-গাছড়ার ওষুধ ব্যাপারী, ইয়াবা ব্যাপারী সব ব্যাপারী ঈদ এলেই চামড়া ব্যবসায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। আর সারা বছর যারা এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তারা মৌসুমি এসব চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে মার খেয়ে লোকসান গোনেন। সম্ভাবনাময় এ সেক্টরটি তাই মার খায় ভরা মৌসুমে। মৌসুমি এসব চামড়া ব্যবসায়ীরা কেউ লাক বাই চান্সে বাজিমাত করে, কেউবা ব্যর্থ হয়ে পুঁজি হারিয়ে আবার পুরনো ব্যবসায় ফিরে যায়, কিন্তু প্রকৃত চামড়া ব্যবসায়ীরা ঈদে যে ধরাটা খায় সেটা আর সারা বছরেও পুষিয়ে উঠতে পারেন না।

মৌসুমি এই চামড়া ব্যবসায়ীর থেকে কোনো অংশে কম যান না আমাদের দেশের এই মৌসুমি রাজনীতিবিদরা। ভাড়াটিয়া, ইমপোর্টেড, কিংবা অতিথি যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এই রাজনীতিবিদদের কাছে মার খায় যারা রাজনীতিকেই ধ্যান-জ্ঞান করেছেন সেসব ত্যাগীরা। যারা বাল্যকালে ছাত্ররাজনীতি করেছেন, পাড়া-প্রতিবেশীরা অকারণে বখাটে বলেছে। কোনো চাকরি না থাকায় প্রিয়তমা বান্ধবী চোখের সামনে দিয়ে অন্যের ঘরে চলে গেছে, রাজনীতির ভবিষ্যতের কথা ভেবে ক্ষমতা, সাঙ্গপাঙ্গ থাকা সত্ত্বেও গোপনে চোখ মুছেছেন। বিয়ে ঠেকিয়ে দেননি। পরে যৌবনে যুবরাজনীতি করেছেন, অকারণে পুলিশের ঠ্যাঙানি খেয়েছেন, শীতে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন গাছতলায়। রাজনীতির প্রতিটি ধাপ পার হয়ে এসে যখন দেখেন তার দীর্ঘ লালিত জনপ্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যায় মৌসুমি নেতাদের হাতে। তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এই মৌসুমিদের পাশে গিয়ে গলা ফাটিয়েছেন তোমার আমার নেতা, আমার নেত্রী....।

চিত্রনায়িকা মৌসুমীকে নিয়ে কয়েক দিন থেকে পত্র-পত্রিকা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কিন্তু একা মৌসুমী কী এমন অপরাধ করলেন? আওয়ামী লীগ থেকে সংরক্ষিত আসনে এমপি হওয়ার জন্য মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। কিন্তু অতীত ও বর্তমানে এই মৌসুমীদেরই তো জয়জয়কার। কবরী থেকে তারানা, মৌসুমী থেকে সাহারা (নায়িকা), আরিফ জয় থেকে মাশরাফি সবাই ওই এক পথের পথিক। নায়িকা মৌসুমী আলোচনায় এসেছেন কারণ তার সঙ্গে বিএনপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক রহমানের একটা ছবি ভাইরাল হয়েছে। কিন্তু তিনিই তো প্রথম মৌসুমি রাজনীতিবিদ নন যিনি মৌসুমের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন করেছেন। তিনি তো মৌসুমি রাজনীতিবিদের কাছে একেবারে শিশু। কিন্তু আলোচনায় এসেছেন কারণ তার নামটাই মৌসুমী বলে। কিন্তু মৌসুমীও একেবারে সাদামাটা নিরালঙ্কার উপমা মাত্র।

অতীত অভিজ্ঞতা বলে এসব মৌসুমি রাজনীতিবিদরা দেশের রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন এই মৌসুমি রাজনীতিবিদদের জন্য হয়ে থাকে। কারণ তাদের সঙ্গে তৃণমূলের রাজনীতিবিদদের কোনো যোগাযোগ থাকে না। তাই তাদের মূল লক্ষ্য থাকে নিজেদের রাতারাতি প্রভাব বিস্তার করে ভোটের মাঠ দখল করা। এবং যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় বসা। এ জন্য তারা বেছে নেন যে এলাকায় মাস্তান, সন্ত্রাসীদের যারা টাকা কিংবা ক্ষমতাকে হাতিয়ার করে এই নতুন রাজনীতি ব্যবসায়ীদের ক্ষমতায় বসাতে পারবেন। এ জন্য ক্ষমতার যাচ্ছেতাই ব্যবহার এবং কালো টাকার ব্যবহারের মাধ্যমে কেউ কেউ ভালো ফলাফল করতে সক্ষম হচ্ছেন, আর যারা ব্যর্থ হচ্ছেন তারা রাতারাতি আবারও পুরনো পেশায় ফিরে যাচ্ছেন। কিন্তু যারা তৃণমূলের নেতা তারা বাকি সময় এর নেতিবাচক ফলটা ভোগ করছেন অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করার মাধ্যমে। আর কেউ কেউ জনপ্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্নকে ছুড়ে ফেলে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। ফলে রাজনীতি থেকে আঞ্চলিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

মৌসুমী যারা ব্যর্থ হচ্ছেন, দেশ-বিদেশে ঘোরাফেরা করে বৈধ-অবৈধ পথে টাকা ইনকাম করে আবারও নব বলে বলীয়ান হয়ে মৌসুমের মওকায় থাকেন, আবার ভোটের নতুন মৌসুম এলে সক্রিয় হন রাজনীতিতে। এটা বর্তমান রাজনীতিতে একটা চলমান প্রক্রিয়া। মৌসুম আসে যায়, মৌসুমীরাও আসে যায়। ধরা খায় দেশের রাজনীতি।

মন্তব্য